৪০০ কোটি টাকায় রাশিয়ার দুই হেলিকপ্টার কিনে কূটনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদন |২০ আগস্ট ২০২৫,বুধবার

বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে দুটি এমআই–১৭১ এ২ মডেলের হেলিকপ্টার কেনার জন্য একটি বড় চুক্তি করেছিল। চুক্তির মোট মূল্য ছিল প্রায় চার শ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে দুই শ আটানব্বই কোটি টাকা ইতিমধ্যেই পরিশোধও করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অস্থিরতা আর রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই হেলিকপ্টারগুলো এখনো বাংলাদেশের মাটিতে পৌঁছাতে পারেনি। সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জেএসসি রাশিয়ান হেলিকপ্টার্স এ বছরের ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলে আলাদা চালানে হেলিকপ্টার দুটি পাঠানোর জন্য প্রস্তুত ছিল। শেষ মুহূর্তে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ সরকার সরবরাহ প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয়। ফলে হেলিকপ্টার দুটি এখনো রাশিয়ার একটি গুদামে পড়ে আছে এবং সেখানে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ খরচ গুনতে হচ্ছে।

এই ঘটনায় বাংলাদেশ এক ধরনের বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে এত বিপুল অর্থ পরিশোধ করার পরও যদি চুক্তি বাতিল করতে হয় তবে তা হবে দেশের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি। শুধু ক্ষতি নয়, আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে, যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ যেদিকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক না কেন, তা সরকারের জন্য হবে কঠিন এবং জটিল।

সরকারি সূত্র বলছে, এ পরিস্থিতি সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো হচ্ছে, হেলিকপ্টার দুটি কোনো সামরিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং বেসামরিক কাজেই ব্যবহার করা হবে। দুর্যোগ মোকাবিলা, উদ্ধার কার্যক্রম, চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিবহন কিংবা পুলিশকে সহায়তা—এসব কাজের জন্য হেলিকপ্টারগুলো কেনা হয়েছে। সরকারের আশা, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিষয়টি বুঝতে পারে তবে বিশেষ ছাড় বা ব্যতিক্রমী অনুমতির মাধ্যমে হেলিকপ্টার আনার পথ তৈরি হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এখানে বিষয়টি এত সহজ নয়। রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা মূলত প্রতিরক্ষা শিল্পকে কেন্দ্র করেই, আর সেই নিষেধাজ্ঞা ভাঙা হলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, হেলিকপ্টার না আনার সিদ্ধান্ত নিলে সরকারের জন্য বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়াবে। ইতিমধ্যেই দেওয়া টাকার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে, সেই সঙ্গে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার মধ্যেও পড়তে পারে।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বাংলাদেশের হাতে খুব সীমিত বিকল্প রয়েছে। একটি পথ হলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ছাড় আদায় করা, অন্য পথ হলো চুক্তির নতুন কোনো শর্ত নির্ধারণ করা কিংবা তৃতীয় কোনো দেশে সরঞ্জাম স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া। কিন্তু প্রতিটি পথই জটিল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ।

রাশিয়ার ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মূলত ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লেনদেন নিষিদ্ধ করেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী বহু দেশ রাশিয়ার সঙ্গে পূর্বের মতো বাণিজ্য করতে পারছে না। বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক কূটনীতির শিকার। যদিও হেলিকপ্টার কেনার পেছনে বাংলাদেশের উদ্দেশ্য বেসামরিক, তবু যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা–সম্পর্কিত যে কোনো লেনদেনই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে। বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক সংঘাতের প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশ সরকার যখন হেলিকপ্টার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন সেটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যাতে দুর্যোগ মোকাবিলা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যন্ত সবাই উপকৃত হতে পারত। কিন্তু এখন সেই বিনিয়োগই হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ধরনের বোঝা।

বাংলাদেশ সরকার আপাতত কূটনৈতিক সমাধানের পথেই এগোচ্ছে। যদি যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করা যায়, তবে শিগগিরই হেলিকপ্টার আনার পথ খুলে যাবে। অন্যথায় সরকারকে অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ও আলোচনার দক্ষতার ওপর।


আরও পড়ুন 

1.ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন: সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করলেন পরিবেশ উপদেষ্টা

2.৪১ হাজার শিক্ষকের নিয়োগ ঝুলছে উপদেষ্টার অনুমোদনের অপেক্ষায়

3.খাদ্য মজুদ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে: দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় ইতিবাচক সাফল্য


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ